নিজস্ব প্রতিবেদক
সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসারদের পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা চলছে। এতে শতশত তরুণ কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই পদে চাকরি করেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সুপারিশে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের তুলনায় একই বছরে সুপারনিউমেরারি পদ্ধতিতে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দিয়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ কারণে ২০১৯ সালে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র অফিসারদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পরবর্তী পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। অথচ একই সময় বা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনেকে ইতোমধ্যে উচ্চতর পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সাত বছর চাকরি করেও এন্ট্রি লেভেল পদে থাকা কর্মকর্তার সংখ্যা সহস্রাধিক। এর মধ্যে কয়েক শত কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেও শুধু জ্যেষ্ঠতা তালিকার জটিলতার কারণে পদোন্নতি থেকে পিছিয়ে পড়ছেন।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়ন এবং সিনিয়র অফিসার ও সমমান পদ হতে প্রিন্সিপাল অফিসার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এর রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক-২ শাখা থেকে গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সোনালী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরিভিত্তিতে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে। আশ্চর্য হবার বিষয় হচ্ছে সোনালী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃপক্ষের চিঠির জবাব না দিয়ে নতুন করে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এ জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এতে জটিলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
২০১৯ সালের নিয়োগ ও পদোন্নতি ঘিরেই মূল জটিলতা :
সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সুপারিশে তিনটি পৃথক ব্যাচে প্রায় এক হাজার সিনিয়র অফিসারকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের নিয়োগের জন্য নির্ধারিত ছিল সাংগঠনিক কাঠামোর নিয়মিত শূন্য পদ।
নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়োগপত্র ১২ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে জারি করা হয় এবং ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে একই বছরের ১৭ নভেম্বর দেড় শতাধিক কর্মকর্তা বা সমমানের কর্মচারীকে নিয়মিত পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওই পদোন্নতি ৭ অক্টোবর ২০১৯ থেকে কার্যকর করা হয়। একই সময়ে সহস্রাধিক কর্মকর্তা বা সমমানের কর্মচারীকে সুপারনিউমেরারি বা অতিরিক্ত পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা ৭ অক্টোবর ২০১৯ থেকে কার্যকর করা হয়। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, একই বছরে নিয়মিত শূন্য পদে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের তুলনায় সাংগঠনিক কাঠামোর অতিরিক্ত পদে বিশেষ ব্যবস্থায় পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের কীভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হচ্ছে?
জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়েই আপত্তি :
সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, সোনালী ব্যাংক পিএলসির সার্ভিস রুল ২০০৮ ও ২০২২ এ নিয়মিত ভিত্তিতে ধারাবাহিক ব্যবস্থায় উচ্চতর পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীগণকে এবং অভিন্ন নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। তবে সুপারনিউমেরারি পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিষয়ে এসব বিধিতে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
তাদের দাবি, এ ক্ষেত্রে সরকারি নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা-২০১১-এর ৬(২)(গ) ধারা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ওই বিধানে বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদোন্নতির কোটা যথাযথভাবে অনুসরন করিলে অতিরিক্ত পদোন্নতিপ্রা্প্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী যে তারিখে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হইতেন, ঐ তারিখ হইতে তাহাদের জ্যেষ্ঠতা গননা করিতে হইবে মর্মে বলা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের যুক্তি, সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি যেহেতু নিয়মিত সাংগঠনিক পদের বিপরীতে নয়, তাই একই বছরে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেছনে রেখে তাদের আগে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
২০১৯ সালের সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন :
সংশ্লিষ্টরা আরও দাবি করছেন, ২০২৬ সালে প্রকাশিত সোনালী ব্যাংক পিএলসির অর্গানোগ্রাম ২০২৫-এ ২০১৯ সালের সুপারনিউমেরারি পদোন্নতিপ্রাপ্তদের পরবর্তীতে সৃজিত পদের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, পদোন্নতির প্রায় পাঁচ বছর পর নিয়মিতকরণের মাধ্যমে তাদের যদি সাংগঠনিক কাঠামোর পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে তাদের জ্যেষ্ঠতা কি সেই নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে বিবেচিত হবে, নাকি ২০১৯ সালের বিশেষ পদোন্নতির তারিখ থেকে? এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তাদের দাবি, নিয়মিত শূন্য পদে আগে থেকেই যোগদানকারী সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপর পরবর্তীতে নিয়মিত করা সুপারনিউমেরারি পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা দেওয়া হলে তা চাকরি বিধিমালা ও ন্যায়সংগত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পদোন্নতি আটকে আছে শত শত কর্মকর্তার :
ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে প্রয়োজনীয় তিনটি পূর্ণাঙ্গ এসিআর সম্পন্ন করার পর অনেক সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ ভিত্তিক পদোন্নতির জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠতা তালিকায় পিছিয়ে থাকায় তাদের বড় একটি অংশ এখনো প্রিন্সিপাল অফিসার পদে পদোন্নতি পাননি।
অন্যদিকে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ ভিত্তিক পদোন্নতি তালিকা বিশ্লেষণ করে কয়েক শত সুপারনিউমেরারি পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
তাদের অভিযোগ, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশেষ করে তৃতীয় ব্যাচের কর্মকর্তাদের সর্বশেষে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার ফলে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি, তবু সমাধান হয়নি :
জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি জটিলতার সমাধান চেয়ে একাধিকবার সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেন ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সুপারিশে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসাররা।
এরপরও কয়েক দফায় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।
ভুক্তভোগীদের দাবি :
সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কারও পদোন্নতির বিরোধিতা করছেন না। তাদের মূল দাবি হলো—সবার জন্য প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং সেই অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া।
বিধি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী, উচ্চতর পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত সাংগঠনিক শূন্য পদের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধাতালিকা অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এবং এরপর সুপারনিউমেরারি বা বিশেষ ব্যবস্থায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা করার কথা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অন্তত একই বছরের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ও সুপারনিউমেরারি পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কোন ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার লিখিত ও বিধিসম্মত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
সোনালী ব্যাংকের তরুণ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা সমাধানের আগে নতুন করে পদোন্নতি দেওয়া হলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে পড়বে। একবার নতুন পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা তালিকা কার্যকর হলে পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করা আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তাদের প্রশ্ন—বছরের পর বছর অপেক্ষা করার পরও যদি মেধা, সরাসরি নিয়োগ ও চাকরির যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না হয়, তাহলে তাদের ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ কী?
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টি শুধু কয়েকশ কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতির স্বচ্ছতার সঙ্গেও জড়িত। তাই নতুন পদোন্নতি দেওয়ার আগে বিতর্কিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা আলোচানা করলেও ম্যানেজমেন্ট ভ্রুক্ষেপ করেনি বা পদ্ধতিগত ভুল সংশোধনে কোনো উদ্যোগ গ্রহন না করায় সাড়ে তিন শতাধিক তরুন কর্মকর্তা এক অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে এবং অপুরনীয় আর্থিক ঝুঁকির সম্মুক্ষীন হচ্ছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাগন এর বিধি মোতাবেক সমাধান এর জন্য চাতক পাখির ন্যায় কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়ে খালি হাতে ফিরে এসে আবার গ্রাহক সেবা দিয়ে যাচ্ছে নিরলস ভাবে। এর শেষ কোথায়? আদৌ কি তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে?