Jugersathi

আওয়ামী লীগবিহীন গোপালগঞ্জের ভোটে ‘ভিন্ন বাস্তবতা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জ সবসময়ই আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার তিনটি আসনে সবসময় আওয়ামী লীগ জয় পেয়ে এসেছে। তবে এবার দলটি নির্বাচনে না থাকায় ভোটের মাঠে এক ‘ভিন্ন বাস্তবতা’ বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রার্থী ও ভোটাররা।
তাদের ভাষ্য, ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখানে ভোটের প্রচার খুব একটা জমেনি। যদিও কিছু প্রার্থী দিনরাত তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
নির্বাচনের আগের দিন বুধবার দিনভর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অবস্থায় এখানে ভোটের হার তুলনামূলক কম হতে পারে। অনেকটা নিরিবিলি নিস্তরঙ্গ পরিবেশ সবখানে। সদরের বাইরেও একই চিত্রের কথা জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে জানা গেছে- গোপালগঞ্জে তিনটি আসনে ১০ লাখ ২০ হাজার ৬০৭ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৫ জন। নারী ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৮৭২ জন। তিনটি আসনের ৩৯৭টি ভোটকেন্দ্রে ২ হাজার ৩১৮টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, ভোটের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও দায়িত্বরত কর্মকর্তারা পৌঁছে গেছেন। ভোটারদের নিরাপত্তায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনটি আসনে মোট ৩০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী আংশিক) আসনে আটজন, গোপালগঞ্জ-২ (সদর-কাশিয়ানী আংশিক) আসনে প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, মোট ১৩ জন এবং গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বুধবার দুপুরে শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় কথা হয় পরিবহন মালিক মিলন শেখের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “গোপালগঞ্জ আসলে আওয়ামী লীগের এলাকা। এখন তারা যেহেতু নেই, তাই ভোটের মাঠে তেমন কোনো উত্তেজনা নেই। অন্যান্য নির্বাচনের সময় এখানে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যেত। মোড়ে মোড়ে লোকজনের জটলা থাকত। নির্বাচন ঘিরে একটা উৎসবের মত পরিস্থিতি থাকত। এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটের নির্বাচনে তেমন চিত্র দেখা যাচ্ছে না।”
শহরের চৌরঙ্গী, পুরনো লঞ্চ ঘাট, পোস্ট অফিস মোড়, বটতলা, পাচুড়িয়া, বেদগ্রাম, ঘোনাপাড়া মোড় এলাকায় দেখা যায়, সাধারণ দিনের মতই চিত্র। কোথাও মানুষের জটলা, চায়ের আড্ডায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা বা উচ্ছ্বাস নেই। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার বন্ধ হ্ওয়ায় প্রার্থী বা কর্মীদেরও তৎপরতা ছিল না বিশেষ। শুধু সড়কে-অলিগলিতে ঝুলছে কিছু ব্যানার-ফেস্টুন।
মুকসুদপুর উপজেলার আব্দুর রাজ্জাক আলীম মাদ্রাসার সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, “নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশ এখানে নেই। কারণ একটা বড় অংশের মানুষের পছন্দের প্রার্থী নেই। তারা একটি দলের সমর্থক, যারা ভোটের মাঠে নেই।
“সেক্ষেত্রে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হ্ওয়ার যথেষ্ট শঙ্কা আছে। তবে বিকল্প হিসেবে কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবে মানুষ। এজন্য ওইসব কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা থাকবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কতটা ভোটার টানতে পারেন, তার ওপর নির্ভর করবে উপস্থিতি।” সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, “দেশের অন্যান্য জেলার মত জমজমাট নির্বাচনি হাওয়া এখানে অনুপস্থিত। আ্ওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকাই এর কারণ।
“এ কারণে ভোটার উপস্থিতিও কম হবে বলে মনে হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ২৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে বলে মনে হয় না।”
প্রার্থীরা যা বলছেন
গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা বলেন, “গোপালগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে এবার আমরা ‘ভিন্ন বাস্তবতায়’ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।
“আগের নির্বাচনগুলোর ভোটার অনুপস্থিতি আর ভীতিকে দূর করে গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাই আমাদের বড় কৌশল। গোপালগঞ্জের মানুষ অপরাধী নন, তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নেতিবাচক ধারণা বদলাতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই দরকার।”
একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ মোল্লা বলেন, “গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় আমরা ভোটারদের কাছে স্পষ্ট করেছি, ৫ অগাস্টের আগে ও পরে যারা কোনো সহিংসতায় জড়িত নন, শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে তাদের হয়রানি করা হবে না। প্রশাসনকেও আমরা এ বিষয়ে জানিয়েছি। নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা আপত্তি করি না, কিন্তু শুধু দলীয় পরিচয়ে কাউকে হয়রানি নয়।”

Scroll to Top