Jugersathi

স্বপ্ন কেড়ে নিল ঘাতক বাস: কোটালীপাড়ায় ৫ মায়ের নিথর দেহ, থামছে না সন্তানদের আহাজারি

সোহেল হাওলাদার:
একটি দুর্ঘটনাই তছনছ করে দিল পাঁচটি সাজানো পরিবার। মাদারীপুরের ঘটকচরে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় প্রাণ হারানো সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকের বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। নিহত এই পাঁচ নারীই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র ‘আশা-ভরসা’ ও প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে গ্রামে মরদেহগুলো পৌঁছালে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আহাজারিতে।

সকালে পাইকের বাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। উঠানে সারিবদ্ধভাবে রাখা পাঁচটি মরদেহ। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বিলাপে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই পাঁচ নারী শুধু গ্রামবাসীই নন, তারা ছিলেন একে অপরের নিকটাত্মীয় এবং একই বাড়ির সদস্য। তারা হলেন— শেফালী বেগম (৪২), কামনা বিশ্বাস (৪১), লালী বাড়ৈ (৪৫), আভা বাড়ৈ (৫০) ও অনিতা বাড়ৈ (৫০)।

নিহতদের মধ্যে ৪১ বছর বয়সী কামনা বিশ্বাসের গল্পটি সবচেয়ে করুণ। দুই বছর আগে স্বামী পংকজ বিশ্বাসকে হারিয়ে ৩ সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন তিনি। দিনমজুরের কাজ করে বড় মেয়ে লিমার নার্সিং পড়ার খরচ আর মেজো মেয়ে পলির দশম শ্রেণির পড়ার খরচ জোগাতেন তিনি। ঘরে ছিল ছয় বছরের ছোট ছেলে এলেক্স। মায়ের উপার্জনেই চলত পড়াশোনা আর অন্ন।

এখন সব অন্ধকার। বড় মেয়ে লিমা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “বাবা আগেই চলে গেছেন, মা ছিলেন আমাদের একমাত্র ভরসা। এখন আমরা এই ছোট ভাইটাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব? আমাদের পড়াশোনাই বা কে দেখবে?”

মাদারীপুর সদর থানা পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচর মিলগেট এলাকায় ‘সার্বিক পরিবহন’-এর একটি দ্রুতগামী বাস বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকের চালক, পাঁচ নারী কৃষি শ্রমিক এবং বাসের এক হেলপারসহ মোট ৭ জন নিহত হন। নিহতরা মাদারীপুর এলাকায় কৃষিকাজ শেষে ইজিবাইকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।

খবর পেয়ে নিহতদের বাড়িতে ছুটে যান কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাগুফতা হক। তিনি শোকার্ত পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা নিহতদের পরিবারের পাশে আছি এবং এতিম সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ব্যবস্থা করব।”

গ্রামবাসীদের মতে, এই নারীরা ছিলেন সংগ্রামী। তাদের ঘামঝরানো পরিশ্রমে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখত পরিবারগুলো। কিন্তু একটি ঘাতক বাস মুহূর্তেই সেই সব স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।

Scroll to Top