Jugersathi

মায়ের নির্মম প্রতারণা ও লালসার শিকার কন্যা: মেয়েকে পতিতালয়ে রেখে মায়ের কোটি টাকার জালিয়াতী বানিজ্য !

স্টাফ রিপোর্টার:
‎যেই মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, সেই মাই যদি নিজের স্বার্থের জন্য সন্তানকে নরকে ঠেলে দেন, তবে সমাজের মানবিক মূল্যবোধের আর কী-ই বা বাকি থাকে? গোপালগঞ্জে ঘটেছে এমনই এক রোমহর্ষক ও বুক ফাটা আর্তনাদের ঘটনা। পারিবারিক অভাবের সুযোগ নিয়ে নিজের ১৭ বছরের কিশোরী কন্যাকে ভালো চাকরির প্রলোভনে বিদেশে পাঠিয়ে , যৌন পল্লীতে অনৈতিক কাজে বাধ্য এবং পরবর্তীতে মেয়ের রক্ত জল করা কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে গর্ভধারিনী মা মরিয়ম বেগমের (৫৯) বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, টাকা আত্মসাতের পর উল্টো মৃত স্বামীকে জীবিত দেখিয়ে এবং নিজেকে প্রতিবন্ধী সাজিয়ে মেয়ের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলার ফাঁদ পেতেছেন এই পাষণ্ড মা।
‎​অনুসন্ধানে জানা যায়, গোপালগঞ্জ শহরের মৌলভীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত কাওছার শেখের পরিবারটি ছিল চরম অভাব অনটনের শিকার। ৪ মেয়ে  ৩ ছেলে স্বামী স্ত্রীর ৯ সদস্যের বিশাল সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাত। এই পারিবারিক অস্বচ্ছলতার দোহাই দিয়ে ২০০৪ সালে মরিয়ম বেগম তার বড় মেয়ে রুমা খানমকে (১৭) বিউটি পার্লারে কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
‎​অভিযোগ রয়েছে, মা মরিয়ম বেগম নিজের সৎ বোন হাওয়া বেগমের মাধ্যমে রুমাকে ভারতে পাঠিয়ে  সেখানে একটি যৌন পল্লীতে  অধিক অর্থের লোভে অনৈতিক কাজে বাধ্য  করে । নরক যন্ত্রণার মাঝে বাধ্য হয়ে রুমাকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে হয়। অসহায় কিশোরী রুমা নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে কিছুদিন পরপর দেশে আসার সময় যে টাকা আনতেন এবং বিদেশ থেকে যা পাঠাতেন, তার সবটুকুই তুলে দিতেন মা মরিয়মের হাতে।
‎​মেয়ের পাঠানো উপার্জনের টাকা দিয়ে মা মরিয়ম বেগম নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে শুরু করেন। কিন্তু যার রক্তে এই ভাগ্যবদল, তাকেই বঞ্চিত করেন সুকৌশলে।
‎​রুমার টাকায় ২০১৭ সালে তার বড় ভাই মাহাবুর শেখকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
‎​সদর উপজেলার রঘুনাথপুরে রুমার টাকায় ৫ কাঠা জমি কেনা হয় । পুরো জায়গা রুমার নামে কেনার কথা থাকলেও দলিলের সময় চতুর মা নিজের নামে অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক রুমার নামে খরিদ করেন। পরর্বতীতে রুমা সেই জায়গায় ওয়াল করা টিনসেড ঘর করতে তার মাকে পুনরায় ৫ লক্ষ টাকা পাঠায় সেখানে প্রতারক মা’ মরিয়ম বেগম মেয়ে রুমা বেগমের জায়গায় ঘর না করে তার নিজের নামে প্রতারণার মাধ্যমে কেনা জমির উপর সেই ঘর নির্মাণ করে । এদিকে মেয়ে রুমার পাঠানো
‎ ৩০ লাখ টাকা দিয়ে নিজের নামে পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্র কেনেন মরিয়ম।
‎​২০১৬ সালে রুমা পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে মায়ের কাছে নিজের জমানো টাকা ফেরত চাইলে মরিয়ম বেগম জানান, বিয়ের পর সব টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ২০১৭ সালে রুমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর রুমা পুনরায় টাকা ফেরত চাইলে মা মরিয়ম গড়িমশি শুরু করেন, যার ফলে মা-মেয়ের সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে।
‎​পরবর্তীতে চতুর মা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর অভিনয় করেন এবং একটি নতুন জমি কেনা ও মৌলভীপাড়া বসবাসরত ছাপড়া টিনের ঘর ভেঙ্গে দুইতলা বাড়ী নির্মানের অজুহাতে রুমার কাছ থেকে আরও ৪০ লাখ টাকা ধার চান। সরল বিশ্বাসে রুমা তার গহনা বিক্রি করে ও জমানো টাকা মিলিয়ে পুনরায় মাকে ৪০ লাখ টাকা দেন। গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা স্বরূপ মা মরিয়ম মেয়েকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪০ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন।
‎​মেয়ে রুমা বেগম মা’ মরিয়ম বেগমের দেওয়া ব্যাংকে চেকটি নিদিষ্ট তারিখে ভাঙাতে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত কোনো টাকা নেই। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী কন্যা রুমা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতারক মায়ের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
‎​আইনি নোটিশ পেয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে মরিয়ম বেগম এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তিনি নিজেকে ‘প্রতিবন্ধী’ সাজিয়ে মেয়ে রুমা ও জামাতা আলমগীর হোসেন ঝন্টুর বিরুদ্ধে আদালতে একটি পাল্টা মামলা ঠুকে দেন (মামলা নং- সিআর ২৩৫/২৬)।
‎​মরিয়ম তার মামলায় দাবি করেন, তার স্বামী কাওছার শেখ ২০২১ সালে ১০ লাখ এবং ২০২২ সালে আরও ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ক্রয় করেন। আর কৌশলে রুমা তার কাছ থেকে ব্লাঙ্ক চেন হাতিয়ে নেন।
‎​গোপালগঞ্জ শহরের মৌলভীপাড়া এলাকায় মরিয়মের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে এবং নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মরিয়মের স্বামী কাওছার শেখ ২০১৩ সালের মে মাসেই মৃত্যুবরণ করেছেন! যে মানুষ ২০১৩ সালে মারা গেছেন, তিনি কীভাবে ২০২১ ও ২০২২ সালে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলেন তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে ।
‎​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান ​কাওছার পেশায় একজন দরিদ্র জেলে ছিলেন। মাছ বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালাতেন। ওই এলাকার সবচেয়ে গরিব পরিবার ছিল এটি। ১৯৯৯ সালে পারিবারিক কলহের জেরে কাওছার স্ত্রী মরিয়মকে পিটিয়ে ডান পা ভেঙে দেন। সেই থেকে মরিয়ম খুঁড়িয়ে হাঁটেন। অথচ এখন সেই পুরনো ভাঙা পা দেখিয়ে আদালতে নিজেকে প্রতিবন্ধী সাজিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
‎​কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী কন্যা রুমা বেগম বলেন, বিউটি পার্লারের কথা বলে মা আমাকে খালা হাওয়া বেগমের কাছে ভারতে পাঠায়। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। আমার সব উপার্জনের টাকা মা নিজের মতো ব্যবহার করেছেন। আমার টাকায় ভাইয়ের বিদেশ যাত্রা, বাড়ি-জমি সব হলো। এখন টাকা ফেরত চাওয়ায় মা আমাকে উকিল নোটিশের জবাব না দিয়ে উল্টো মৃত বাবাকে জীবিত বানিয়ে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। মা হয়ে তিনি আমার সাথে যে জঘন্য আচরণ করেছেন, আমি প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
‎​সব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মরিয়ম বেগম বলেন, “আমার মেয়ে রুমার কোনো টাকাই আমার কাছে নেই। আমার স্বামীর মৃত্যুর আগে তিনিই সব করে গেছেন। টাকার লোভেই মেয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাই আমিও নিরুপায় হয়ে রুমা ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি।” তবে স্বামী ২০১৩ সালে মারা যাওয়ার পরও ২০২১ ও ২০২২ সালে কিভাবে দুই মেয়াদে ৩০ লক্ষ টাকার  সঞ্চয়পত্র কিনলেন এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি ।

Scroll to Top