গাজী তৌহিদুল ইসলাম
শহরগুলো কখনও কখনও নীরব থাকে না। তাদের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকে এমন উত্তাল শক্তি, যা হাজার বছরের নির্মিত সভ্যতাকে মুহূর্তেই ভেঙে দিয়েছে—এমন এক বাস্তবতা আজ ঢাকাও অনুভব করেছে। মাটির নিচে সঞ্চিত অদৃশ্য টান, অসংখ্য চাপ ও সংঘর্ষ—সবশেষে যখন ফেটে বেরিয়ে আসে, তখন মানুষ তা অনুভব করে ভূমিকম্প নামে। ঠিক সেই কম্পনই আজ ঢাকার প্রতিটি প্রাণে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কম্পন শুধু এক মুহূর্তের আলোড়নই নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় প্রলয়ের আশংকা। এমন পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ভূমিকম্প কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি এক চরিত্রহীন শক্তি, যা ধ্বংসের রূপ নিতে পারে, কিন্তু সেই সঙ্গে একটি গভীর নৈতিক এবং মানবিক আহ্বানও হয়ে ওঠে। কিন্তু এই কম্পনের অভিব্যক্তি কেবল ভূতত্ত্বের ভৌত কম্পনই নয়; ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবচেতনার গভীরে এর প্রতিধ্বনি আরও দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূমিকম্পকে বোঝার এই দীর্ঘ পথযাত্রায় মানুষের উপলব্ধি পাল্টেছে বহুবার—কখনও ভয়কে দেবত্বে রূপ দিয়েছে, কখনও কল্পনা ও পুরাণে ব্যাখ্যা খুঁজেছে, আবার কখনও বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছে। কুরআন এই ঘটনাকে দেখিয়েছে নৈতিক শিক্ষা, সতর্কবার্তা ও ইতিহাসের বাস্তবতার দৃষ্টিতে—একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা মানুষকে তার সীমাবদ্ধতার কথা ভুলতে দেয় না।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভূমিকম্প বহু বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মিনোয়ান সভ্যতা, ক্রিটের উপকূলবিধ্বংসী কম্পন, কিংবা পম্পেইয়ের অনন্ত নীরবতা—সবই ভূমিকম্পের পরিণতির গল্প। কিন্তু এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। তখন দেবতা, পৌরাণিক প্রাণী কিংবা রহস্যময় শক্তিকেই দায়ী করা হতো। গ্রিকরা ভাবত, সমুদ্রদেবতা পোসাইডন তার ত্রিশূল দিয়ে পৃথিবী কাঁপিয়ে দেন। ভারতের পুরাণে পৃথিবী বিশাল কচ্ছপ বা হাতির ওপর ভর করে আছে—প্রাণীটি দুললে পৃথিবী কেঁপে ওঠে। চীনে ড্রাগনের নড়াচড়াকে মানা হতো ভূমিকম্পের কারণ। এমনকি অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যাও ভুল ছিল—ভূগর্ভে বাতাস আটকে গিয়ে ধাক্কা দিলে ভূমিকম্প হয়।
কুরআন এমন এক সময় নাজিল হয়েছিল যখন এই সব ব্যাখ্যাই মানুষের চিন্তার পরিসর নির্ধারণ করত। কিন্তু কুরআন ভূমিকম্পকে শুধুমাত্র এক প্রাকৃতিক ঘটনার মতো ভাবেনি; এটি এসেছে সতর্কবার্তার ভাষায়, এসেছে নৈতিক অস্তিত্বের আলোচনায়, এসেছে ইতিহাসের দৃষ্টান্ত হিসেবে। বিশেষভাবে তিনটি জাতির ধ্বংসে ভূমিকম্পের ভূমিকা কুরআনে এসেছে স্পষ্ট ভাষায়—সামূদ, মাদইয়ান ও লুত জাতি।
সামূদ জাতির অহংকার ও অবাধ্যতা তাদের পতন ডেকে আনে। কুরআনে এসেছে: “সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে গ্রাস করে নিলো, ফলে তারা নিজেদের গৃহের মধ্যেই নতজানু হয়ে পড়ে রইল।”
— সূরা আল-আরাফ ৭:৭৮
এ ঘটনাপ্রবাহ আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে: “আর যারা জুলুম করেছিল, তাদেরকে চিৎকারের আঘাত গ্রাস করল; ফলে তারা নিজেদের ঘরেই মৃতদেহের মতো পড়ে রইল।”
— সূরা হূদ ১১:৬৭
এই জাতির ধ্বংসস্তূপ আজও মাদায়েন সালেহ এলাকায় নীরব সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
মাদইয়ান জাতির গল্পটিও তেমনই দৃশ্যমান সতর্কবার্তা। তারা বাণিজ্যে প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া এবং দুর্নীতিকে জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলেছিল। নবী শুআইব (আ:) তাদের সততার আহ্বান জানালেও তারা অস্বীকার করে। ইতিহাসবিদেরা মাদইয়ানের অবশিষ্টাংশ আজও জর্ডান ও উত্তর-পশ্চিম সৌদি অঞ্চলে খুঁজে পান। কুরআন তাদের পরিণতি এভাবে বর্ণনা করে: “অতঃপর ভূ-কম্পন তাদেরকে গ্রাস করল, ফলে তারা নিজেদের গৃহেই উপুড় হয়ে পড়ে রইল।”
— সূরা আল-আরাফ ৭:৯১
আরও বলা হয়েছে: “কিন্তু তারা তার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল; অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল; ফলে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল।”
— সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৩৭
লুত জাতির ওপর যে অভূতপূর্ব ধ্বংস নেমে এসেছিল, তা বহুস্তরীয়। তাদের নৈতিক বিপর্যয়, অসভ্যতা ও অবাধ্যতা সেই ধ্বংসের ভূমিকা রচনা করে। কুরআন তাদের শাস্তির প্রথম ধাপ হিসেবে ভূমির বিস্ফোরণ, সশব্দ কম্পন ও শহর উল্টে যাওয়ার কথা বলেছেন। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে: “অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছাল, তখন আমি উক্ত জনপদকে উপরকে নীচে করে দিলাম এবং তার উপর স্তরে স্তরে কাঁকর পাথর বর্ষণ করলাম।”
— সূরা হূদ ১১:৮২
তাফসিরবিদরা বলেন—এই ‘উপরে তুলে নিচে ফেলে দেওয়া’র প্রথম ধাপই ছিল ভূমিকম্পের ভয়ংকর অভিঘাত।
কুরআনে ভূমিকম্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর বর্ণনা এসেছে কিয়ামতের প্রসঙ্গে। সূরা যিলযালে পৃথিবীর এমন এক দৃশ্য ছবি আঁকা হয়েছে, যা ইতিহাসের সব ভূমিকম্পের শক্তিকে ছাপিয়ে যায়।
“যখন পৃথিবী তার ভারি কম্পনে কাঁপবে, এবং পৃথিবী তার অন্তর্গত সব কিছু বের করে দেবে… সেদিন সে তার বিবরণ প্রকাশ করবে।”
— সূরা যিলযাল ৯৯:১–৪
এ বর্ণনা কেবল ভয় দেখায় না; এটি মানুষকে স্মরণ করায় যে মহাবিশ্বের কাঠামোও চিরস্থায়ী নয়।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবু তা কুরআনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করে না। বিজ্ঞান জানায়—ভূমিকম্প সৃষ্টি হয় পৃথিবীর ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষ, সরে যাওয়া ও ঘর্ষণের ফলে। হাজার বছরের জমা চাপ এক মুহূর্তে মুক্তি পেলে সিসমিক তরঙ্গ ছুটে যায়, কেঁপে ওঠে ভূমি। প্লেট টেকটনিক্স, রিখটার স্কেল, সিসমোগ্রাফ—এসবই এসেছে ২০শ শতকে, কুরআন নাজিলের বারো শতক পরে।
ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মুখোমুখি দাঁড় করানো তাই অযৌক্তিক। কারণ বিজ্ঞান জানায় ঘটনাটি কীভাবে ঘটে; কুরআন জানায় এর মধ্য দিয়ে মানুষ কী শিক্ষা নেবে। একটি ব্যাখ্যা ভৌত সত্য, আরেকটি নৈতিক সত্য—উভয়ই অপরিহার্য। প্রকৃতির শক্তি মানুষকে নম্র হতে শেখায়, আর কুরআন মানুষকে সতর্ক, সৎ ও দায়িত্ববান হতে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মানুষ যতো উন্নত হোক, প্রকৃতির এক মুহূর্তের কম্পন তাকে আবার মনে করিয়ে দেয়—জীবন তার চিন্তার চেয়েও নাজুক। আর সেই নাজুকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের প্রকৃত শিক্ষা: সতর্কতা, নৈতিকতা, নম্রতা এবং ফিরে আসার আহ্বান। ভূমিকম্প তাই কেবল একটি ভূতাত্ত্বিক কম্পন নয়; এটি ইতিহাস, ধর্ম ও বিজ্ঞানের এক অনন্ত সংলাপ—যা মানুষের অস্তিত্বকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করে, আবার নতুন করে পথ দেখায়।
লেখক: গাজী তৌহিদুল ইসলাম, জনসংযোগ কর্মকর্তা, অর্থ মন্ত্রনালয়।