গাজী তৌহিদুল ইসলাম
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
“—-অবশেষে যখন সে পূর্ণ যৌবনে উপনীত হয় এবং চল্লিশ বছরে পৌঁছে যায়, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন। আর আমি যেন এমন সৎকাজ করি, যা আপনি পছন্দ করেন। আর আমার জন্য আমার সন্তান-সন্ততিদেরও সংশোধন করে দিন। নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে তওবা করলাম এবং নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।”
– সুরা আল-আহকাফ, আয়াত ১৫
আয়াতটি লক্ষ্য করলে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এখানে চল্লিশ বছরকে কেন্দ্র করে যে দোয়া শেখানো হয়েছে, সেটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের দোয়া নয়। বরং এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি, পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা, সৎকাজের আকাঙ্ক্ষা, সন্তান-সন্ততির সংশোধনের আবেদন এবং তওবার ঘোষণা।
অর্থাৎ জীবনের এই পর্যায়ে এসে মানুষের দৃষ্টিটা যেন ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’র দিকে প্রসারিত হয়। এটাই সম্ভবত চল্লিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কিছু তাফসিরবিদ চল্লিশ বছর বয়সকে মানুষের বুদ্ধি, বিবেচনা ও অভিজ্ঞতার পরিণতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এটিকে এমন কোনো সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক সূত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই যে প্রত্যেক মানুষ চল্লিশে পৌঁছালেই একই মাত্রার প্রজ্ঞা বা মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করবেন। কেউ চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও ভুল থেকে শিক্ষা নেন না। আবার কেউ তুলনামূলক কম বয়সেই গভীর জীবনবোধ অর্জন করেন। সুতরাং চল্লিশের তাৎপর্যকে বয়সের জাদুকরি সীমারেখা হিসেবে নয়, বরং আত্মমূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
রাসুলুল্লাহ (স:)-এর জীবনে ৪০ বছর ছিল এক ঐতিহাসিক বাঁক। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ৪০ বছর বয়সে প্রথম ওহি লাভ করেন। হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ:)-এর মাধ্যমে নাজিল হয়- “পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নবুয়তের দায়িত্ব এবং পরবর্তী ২৩ বছরের ওহির যুগ, যা আরবের সমাজকেই শুধু পরিবর্তন করেনি, বিশ্ব-ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিয়েছে। নবুয়তের দায়িত্ব তাঁর ওপর নেমে এসেছিল ৪০ বছরে, কিন্তু তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তার বহু আগে। ৪০ বছরের আগে তিনি ছিলেন সমাজের কাছে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত। সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, উত্তম চরিত্র ও ন্যায়পরায়ণতায় ছিলেন অনন্য। অর্থাৎ মহান দায়িত্বের প্রকাশ ঘটেছিল ৪০ বছরে, কিন্তু সেই দায়িত্ব বহনের যোগ্যতা গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। আজকের সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বড় দায়িত্ব হঠাৎ আসে না; দায়িত্বের উপযুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু করতে হয়।
মূসা (আ:)-এর জীবনে আরেকটি ইঙ্গিত, সূরা আল-কাসাসে হযরত মূসা (আ:) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- “যখন সে পূর্ণ শক্তিতে পৌঁছল এবং পরিণত হলো, তখন আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করলাম।
-সূরা আল-কাসাস: ১৪
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রা:)-এর সূত্রে “ইস্তাওয়া” বা পরিণত হওয়ার পর্যায়কে ৪০ বছর হিসেবে ব্যাখ্যা করার মত পাওয়া যায়। এখানেও ৪০-এর সঙ্গে আমরা দেখতে পাই, পরিণতি, হিকমত ও জ্ঞান।
তবে সব নবী-রাসুলই যে চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছে বিষয়টি আবার এমন নয়। নবুয়ত মানুষের বয়সের স্বাভাবিক অর্জন নয়; এটি আল্লাহর বিশেষ নির্বাচন। তাই চল্লিশের সঙ্গে নবুয়তের সম্পর্ককে মানুষের জন্য কোনো ধর্মীয় ‘বয়সসীমা’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর জীবনের এই ঘটনা আমাদের অন্য একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, মানুষ জীবনের চার দশক অতিক্রম করার পর তার দায়িত্ববোধ কতটা গভীর হওয়া উচিত?
শরীর বলে বয়সের কথা, জীবন বলে অভিজ্ঞতার। চল্লিশে পৌঁছে শরীরও তার নিজস্ব ভাষায় সময়ের হিসাব জানাতে শুরু করে। চুলে পাক ধরতে থাকে। মুখে ও কপালে ভাঁজের রেখা স্পষ্ট হয়। আগের মতো দীর্ঘ সময় কাজ করার পরও শরীর সহজে ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে পারে না। রাত জাগার প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হতে হয়। এগুলো আতঙ্কের বিষয় নয়; বরং জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তন। চল্লিশ মানেই শরীর ভেঙে পড়া নয়, আবার চল্লিশের পর সবকিছু আগের মতো থাকবে, এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের যত্ন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার গুরুত্বও বাড়ে। নারীদের ক্ষেত্রে চল্লিশের আশপাশে হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও বয়সজনিত পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ চল্লিশ আমাদের দুর্বলতার ঘোষণা নয়; বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার সতর্কবার্তা।
আধুনিক জীবনচর্চায় একটি জনপ্রিয় কথা আছে- ‘চল্লিশের পরই জীবন শুরু হয়।’ বাক্যটি বৈজ্ঞানিক সূত্র নয়, কিন্তু এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সত্য রয়েছে। জীবনের প্রথম কয়েক দশকে মানুষ অনেক সময় অন্যের প্রত্যাশা, সামাজিক প্রতিযোগিতা, পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটতে থাকে। চল্লিশের পর অনেকেই প্রথমবারের মতো নিজেকে প্রশ্ন করেন- আমি যা অর্জন করেছি, তার কতটা সত্যিই আমার? আর যে জীবন কাটাচ্ছি, সেটিই কি আমি চেয়েছিলাম? এই আত্মজিজ্ঞাসা কখনো মানুষকে অস্থির করে, আবার কখনো মুক্তিও দেয়। আজকের ভোগবাদী সমাজ মানুষকে শেখায়, ৪০-এর পর যৌবন ধরে রাখতে হবে, বয়স লুকাতে হবে, আরও বেশি অর্জন করতে হবে। কুরআন যেন উল্টো প্রশ্ন করে- “এতদিনে তুমি কী অর্জন করেছ, আর তোমার রবের জন্য কী অর্জন করেছ?”
কারও মনে হয়, এতদিনের দৌড়ের মধ্যে সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ও মুহূর্ত হারিয়ে ফেলেছে। কেউ উপলব্ধি করেন, অর্থ উপার্জন প্রয়োজন, কিন্তু অর্থই জীবনের একমাত্র সাফল্য নয়। কেউ বুঝতে পারেন, সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে মূল্যবোধ রেখে যাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চল্লিশ তখন বয়সের নয়, অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের সময়। চল্লিশের মানুষ যখন আয়নায় নিজের মুখ দেখেন, তিনি শুধু কয়েকটি নতুন বলিরেখা দেখেন না। তিনি দেখতে পান সময়কে। কয়েক বছর আগের ছবির সঙ্গে বর্তমান ছবির তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। চুলে সাদার উপস্থিতি বাড়ে, মুখে বয়সের ছাপ পড়ে। যে শরীর একসময় সামান্য বিশ্রামেই সতেজ হয়ে উঠত, এখন তার একটু বেশি যত্ন প্রয়োজন।
কিন্তু বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটে ভেতরে। মানুষ তখন নিজের অতীতের সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করে। কিছু সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা হয়। কিছু ভুলের কথা মনে পড়ে। আবার এমন অনেক সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, যেগুলো হয়তো তখন কঠিন মনে হয়েছিল, কিন্তু পরে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। যে পিতা-মাতার অনেক কথাকে একসময় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কথার অর্থ নতুন করে বোঝা যায়। আর নিজের সন্তান যখন বড় হতে থাকে, তখন মানুষ উপলব্ধি করতে থাকে, তার প্রতিটি আচরণ আসলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি নীরব শিক্ষা।
এখানেই সূরা আল-আহকাফের আয়াতটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। শুধু ‘আমার’ জন্য নয়, পিতা-মাতার জন্যও শুকরিয়া। শুধু ‘আমি ভালো থাকি’ নয়, সৎকাজের সামর্থ্যও চাই। শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, সন্তান-সন্ততির সংশোধনের জন্যও দোয়া। এটি নিছক বয়সের আলোচনা নয়; এটি দায়িত্বের বিস্তারের আলোচনা।
চল্লিশ বছর বয়সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ‘আমি কতটা সফল?’ এটি নয়। প্রশ্ন হতে পারে- আমি কতটা কৃতজ্ঞ? আমি কতটা দায়িত্বশীল? আমার কারণে কতজন মানুষের জীবন সহজ হয়েছে? আমার সন্তান আমার কাছ থেকে কী শিখছে? পিতা-মাতার জন্য আমি কী করেছি? আর আল্লাহর দেওয়া সময় ও সামর্থ্যের কতটা সঠিক কাজে ব্যবহার করেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আয়নায় দেখা যায় না। এগুলোর উত্তর খুঁজতে হয় নিজের জীবনযাপনে। চল্লিশ তাই কোনো শেষরেখা নয়। এটি তারুণ্যেরও মৃত্যু নয়। বরং এটি এমন একটি বাঁক, যেখানে মানুষ চাইলে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়টি প্রথম অধ্যায়ের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে লিখতে পারে।
যৌবন মানুষকে শক্তি দেয়। অভিজ্ঞতা মানুষকে শিক্ষা দেয়। আর পরিণত বয়স মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়, এই শক্তি ও অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত কোথায় ব্যয় করা হবে। সম্ভবত চল্লিশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। এই বয়সে মানুষ বুঝতে শেখে, জীবন দীর্ঘ নয়, বরং সীমিত। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু আর পরে করার সুযোগ নাও আসতে পারে। তাই চল্লিশের সবচেয়ে সুন্দর উচ্চারণ হয়তো কোনো আত্মতুষ্টির ঘোষণা নয়; বরং সেই কোরআনের প্রার্থনাই- “হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি…”
চল্লিশ তখন কেবল জন্মদিনের কেকের ওপর জ্বলে ওঠা চারটি মোমবাতি নয়। চল্লিশ হলো একবার থেমে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার বয়স- আমি এতদিন কী পেয়েছি, কী হারিয়েছি; আর বাকি সময়টুকু দিয়ে আমি আসলে কী রেখে যেতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে- চল্লিশ কেবল বয়সের একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে, নাকি হয়ে উঠবে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মজিজ্ঞাসার একটি অধ্যায়।