বিশেষ প্রতিনিধি
বাড়িতে ভালই ছিলেন এনামুল শেখ। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাড়িতে বসে তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করতেন। পরিবারও সজ্জল। ফলে পরিবারের কেউ এনামূলকে প্রবাসে যেতে উৎসাহ দেয়নি।
কিন্তু অনেক বেশি টাকা উপার্জন আর নিরাপদ ভবিষ্যতের ভাবনায় এনামুল এলাকার অনেক যুবকের মত ইটালি যাওয়ার বায়না ধরেন। এবং পরিচিত এক দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে তিনি মারা যান।
এনামুলের মা মনজেরা বেগম (৬০) আক্ষেপ আর বিলাপ করে বলছিলেন, “ওই বিদেশে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গ্যছোলো। ওরে যাতি দেব না। (ছেলে) বলছেলে সকল মানুষ যায়, আমি গেলি কী হবে? ওরে বাবারে, তোমারে মৃত্যু টাইনে নেছেরে।
“আমি ছেলের লাশটার চিহ্ন দেখপার চাই। ওরে আমার কোলের তা রে। লাশডা দাবি হরি। আর কোনো অভিযোগ নাই। ওর মৃত্যু ওই জায়গা ছেলে। আল্লার মাল আল্লায় নেছে বাবা। অমি সরকারের কাছে লাশডা চাই।”
১৩ নভেম্বর রাতে লিবিয়ায় ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন আল-খুমস উপকূলে দুটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে মুকসুদপুর উপজেলার দুজন নিহত হন। তারা হলেন উপজেলার ননিক্ষীর ইউনিয়নের পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামের ইয়াকুব আলী শেখের ছেলে এনামুল শেখ (২৭) এবং ওই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য জাহিদ শেখের ছেলে আনিস শেখ (২৫)।
দুই পরিবারের সদস্যরা সন্তানদের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক থেকে জানতে পারেন। পরে দালাল ও তাদের সঙ্গে আরও যারা ছিলেন তাদের মাধ্যমে নিশ্চিত হন।
একই নৌকা ডুবির ঘটনায় মুকসুদপুর উপজেলার আরও পাঁচ যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন- পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামের আওলাদ শেখের ছেলে ইব্রাহিম শেখ, একরাম মিনার ছেলে দুলাল মিনা, হায়দার মিনার ছেলে আশিক মিনা, খালেক মোল্লার ছেলে হাবিবুল্লাহ মোল্লা সোহেল এবং গোহালা ইউনিয়নের গুণহর গ্রামের হাফিজ মিনার ছেলে নিয়াজ মীনা।
নিহত দুজনের পরিবার জানায়, ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় একটিতে ছিলেন বাংলাদেশের ২৬ নাগরিক। ঘটনার পর চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন তথ্য সংগ্রহের পর তারা নিশ্চিত হন এনামুল ও আনিস নিহত হয়েছেন। সোমবার বিকালে পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এনামুল শেখের বাড়ির উঠানে চেয়ার পেতে প্রতিবেশীরা বসে আছেন। এনামুলের বাবা ইয়াকুব, মা মনজেলা ও ভাই গিয়াস উদ্দিনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনরা। একপর্যায়ে নিজেরাই কেঁদে ফেলেন। তারা জানান, ইয়াকুব শেখের চার ছেলে। কোনো মেয়ে নেই। এনামুল চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট।
পরিবার জানায়, ইয়াকুবের বড় ছেলে গিয়াস উদ্দিন শেখ শারীরিক প্রতিবন্ধী, তিনি গ্রামে মুদি দোকান করেন। মেজ ছেলে তাজ উদ্দিন শেখ ইটালি প্রবাসী। তিনিও অবৈধভাবেই সমুদ্র পথে ইটালি গিয়েছেন। সেজ ছেলে জসিম উদ্দিন পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি করেন।
ইয়াকুব শেখ দীর্ঘদিন নরসিংদীর শিবপুরে কসমেটিক্সের ব্যবসা কেরেছেন। পাঁচ বছর আগে ছেলেদের অবদারে তিনি ব্যবসা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসেন। তারপর থেকে বাড়িতেই বসবাস করছেন।
ইয়াকুব শেখ বলেন, ছেলে এনামুল বিএ পাশ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে এমএ ভর্তি হয়েছিল। বাড়িতে বসে ফ্রিল্যান্সিং করে ৫০ হাজার টাকা আয় করত। আমরা তাকে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেই।
“কিন্তু ছেলে বিয়ে না করে সমুদ্র পথে ইটালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তাকে বাধা দেই। কিন্তু আমার কথা শোনেনি। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বদরপাশা গ্রামের দালাল ইমামুল মাতুব্বর আমাদের আত্মীয়। তাকে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলাম। ইটালি পৌঁছানোর পর বাদবাকি টাকা দেওয়ার কথা ছিল।”
ইয়াকুব বলেন, “দালাল বলেছিল, যাওয়ার সময় ধরা খেলে ছাড়িয়ে আনবে। কিন্তু সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় তিনি নেবেন না। জেনে-বুঝেই আমার ছেলে এ পথে বেছে নেয়। এখানে দালালের কোনো দোষ নেই। দোষ আমার কপালের।”
নৌকা ডুবির ঘটনা বর্ণনা করে ইয়াকুব আলী বলেন, “১০ অক্টোবর বাংলাদেশ থেকে রওনা হয় এনামুল। ১৩ নভেম্বর রাতে লিবিয়ার আল-খুমস উপকূল থেকে নৌকায় ওঠে ছেলে। কিছু দূর যেতেই নৌকাটিকে ধাওয়া করে কোস্ট গার্ড। তাদের নৌকার মাঝ বরাবার আরেকটি নৌকা উঠে যায়। এনামুলদের নৌকাটি ডুবে যায়। এতে এনামুল মারা গেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।”
এনামুল শেখের বড় ভাই গিয়াস উদ্দিন শেখ বলেন, “আপনারা এতটুকু করেন, যেন আমার ভাইকে দেশে আনতে পারি, দেশের মাটিতে কবর দিতে পারি। আমার ভাইয়ের কবরে আমরা যেন মাটি দিতে পারি।”
এনামুলের বাড়ির অদূরেই আনিস শেখের বাড়ি। তবে সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেশীরা জানান, ছোটবেলায় মাকে হারান আনিস। বাবা ও চার বোনের সংসার। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে আনিস বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্স হিসেবে কর্মরত। তাদের সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে। নাম আনিসা। ওই গ্রামের ইউপি সদস্য আলমগীর মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মারা যাওয়ার পরই আমাদের হুঁশ ফেরে। অবৈধ পথে ইতালি যাওয়া খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সব জেনেশুনে আমরা সর্বস্ব খুইয়ে প্রিয় সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। একটু ভালো থাকার আশায় এত টাকা দিয়ে ছেলেকে বিদেশ পাঠানো হয়। “এখন সন্তানের লাশ ফিরবে কি-না, সেই অনিশ্চয়তায় পরিবারগুলো। বিদেশ গমন বিষয়ে সচেতনতা, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিদেশে বৈধ অভিবাসন সুযোগ বাড়ানো ছাড়া এ মৃত্যুর মিছিল থামবে না।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুকসুদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, নিহত দুজন ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। লাশ ফেরাতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য পাঠানো হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ষষ্টীপদ রায় বলেন, “বৈধ অভিবাসন সুযোগ সরকার সৃষ্টি করেছে। সরকারিভাবে বৈধ পথেই ইটালি যাওয়া যায়। এ ব্যাপারে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ করছি। তারপরও মানুষ অবৈধ পথে ইটালি যাচ্ছে। মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এটি দুঃখজনক। আমার বিষয়টি উপরের কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”